বিয়ের সময় সতর্ক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া এড়ানো সম্ভব

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা এবং সহায়তা দেয় এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পুষ্টিবিদ ও কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করছেন রুমা (আসল নাম নয়)। কৈশোরে থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত হওয়ার পর তিনি ভীষণ কষ্টের অভিজ্ঞতার শিকার হন। প্রায় আট বছর পর সঠিক চিকিৎসা পাওয়ায় তাঁর অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। তিনি পুষ্টিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করে চাকরিতে যোগ দেন। সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। থ্যালাসেমিয়া মোকাবিলা করে যে সুস্থ ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপন সম্ভব, তিনি তার একটি উদাহরণ।

থ্যালাসেমিয়া ত্রুটিযুক্ত জিনের কারণে হওয়া একটি বংশগত রক্ত–সম্পর্কিত রোগ। মা-বাবা উভয়ে থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করলে, অর্থাৎ বাহক হলে তাঁদের সন্তানের জন্মের সময় থেকেই রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগটি ধরা পড়ে শিশুটির জন্মের এক বা দুই বছর পর, যখন উপসর্গ হিসেবে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃদু বা তীব্র রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে, যা গুরুতর হলে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হয় এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। থালাসেমিয়ার বাহক যে কেউ হতে পারে। বাহকের সাধারণত কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি ও হাসপাতাল বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণা করে দেখেছে যে তাঁদের ১০-১২ শতাংশ এই রোগের বাহক। ঢাকা শিশু হাসপাতালের আরেকটি জরিপের মাধ্যমে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। ধারণা করা যায়, ১০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশি থ্যালাসেমিয়ার বাহক। বর্তমানে ৯০ হাজার শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। প্রতিবছর ১২ থেকে ১৫ হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন নিরাপদ রক্তের প্রয়োজনীয় উপাদান লোহিত রক্তকণিকা পরিসঞ্চালন, লৌহ অপসারণকারী ওষুধ ব্যবহার, অন্যান্য উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ। ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি ও হাসপাতালে বেশ কয়েকজন শিশু ও কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে দেখা হয়। তারা রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য মাসে এক বা দুবার সেখানে আসে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেটি থ্যালাসেমিয়া রোগী ও তাদের মা–বাবাদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত। ১৯৮৯ সালে ওমর গোলাম রাব্বানী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ছেলে ১৯৮৩ সালে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হন এবং মাত্র ২২ বছর বয়সে মারা যান। তখন বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসার সুযোগ ছিল খুব সীমিত। থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা ও প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য রাব্বানী নিরলসভাবে কাজ করছেন।

গ্রিস ও তুরস্কের মতো ভূমধ্যসাগরীয় দেশ এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া বেশি দেখা যায়। ২০২১ সালে থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ‘রিভিউইং দ্য ইফেক্টিভনেস অব থ্যালাসেমিয়া প্রিভেনশন প্রোগ্রামস’ (থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির কার্যকারিতা পর্যালোচনা) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের ৫১টি দেশের থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিটি দেশকে ‘এ’ থেকে ‘ডি’র মধ্যে একটি গ্রেড দেওয়া হয়। ‘ডি’ হলো সর্বনিম্ন। এমন দেশগুলো এর অন্তর্ভুক্ত, যেখানে থ্যালাসেমিয়া মোকাবিলায় গুরুতর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে এবং জাতীয় স্তরে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন। বাংলাদেশ ‘ডি’ পেয়েছে, যার অর্থ থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় আমাদের আরও গতি আনতে হবে।

বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা পাওয়া যায়। যাদের রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন, তাদের জন্য রক্ত পাওয়া সহজ নয়। লৌহ অপসারণকারী ওষুধের অনেক দাম। একজন রোগীর থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে ৭ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য এ ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণ খুব কঠিন। অল্প কয়েকটি সংস্থা কিছু রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক থ্যালাসেমিয়া রোগী চিকিৎসা পায় না এবং অকালে মারা যায়। ব্যয় বহন করতে পারলেও চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া রোগী ও তার পরিবারের জন্য নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ বাস্তবতায় রোগটি প্রতিরোধ করাই সর্বোত্তম উপায়।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির মূল উপাদানগুলো হলো থালাসেমিয়া–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রাক্‌-বিবাহ স্ক্রিনিং এবং কাউন্সেলিং, চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা। এ ধরনের কর্মসূচির ফলেই সাইপ্রাসসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থ্যালাসেমিয়া প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আছে জানার পর অনেক মা-বাবা আফসোস করেন, তাঁরা দুজনেই যে বাহক, এ বিষয়ে আগে জানলে রোগটি এড়ানো যেত। একটি বিশেষ রক্ত পরীক্ষার (হিমোগ্লোবিন-ইলেকট্রোফোরেসিস) মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার বাহক শনাক্ত করা যায়। কেউ বাহক হলে নিশ্চিত করতে হবে তাঁর জীবনসঙ্গী যাতে বাহক না হন। বাংলাদেশে তরুণ-তরুণীরা যদি থ্যালাসেমিয়া কীভাবে হয় জানতে পারেন এবং বিনা মূল্যে তাঁদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়, তাহলে তা রোগটি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

থ্যালাসেমিয়ার রোগী অথবা বাহকের অপরাধ বোধে ভোগার কোনো কারণ নেই। থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়। ভুল ধারণার কারণে কখনো কখনো থাল্যাসেমিয়া রোগীরা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়, যার অবসান প্রয়োজন। সামাজিক বৈষম্যে ও থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি ও হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. এ কে এম একরামুল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে সরকার ঢাকার সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও সব বিভাগীয় হাসপাতালে বিশেষায়িত থ্যালাসেমিয়া কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে, যা ধীরে ধীরে জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। সারা দেশে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য একটি জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।’

আশা করি, সরকার থ্যালাসেমিয়া মোকাবিলায় সব উদ্যোগের সমন্বয়ে নেতৃত্ব প্রদান করবে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কষ্ট হ্রাস পাবে এবং ভবিষ্যতে থ্যলাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে যেন কোনো শিশুর জন্ম না হয়, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

●লায়লা খন্দকারউন্নয়নকর্মী


First published on প্রথম আলো (Prothom Alo) | 3 জানুয়ারি 2022

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top