‘আপনার সন্তানের শ্বাসকষ্টের রোগ ভালো করতে চাইলে ঢাকা শহরের বাইরে গিয়ে থাকতে হবে।’ এভাবেই একজন নামকরা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চার বছর বয়সী এক শিশুর মা-বাবাকে বলছিলেন। এই পরামর্শ থেকে ঢাকা শহরের বাতাস কতটা দূষিত এবং সেই দূষণে মানুষ কতটা হতাশ ও নিরুপায়, সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। বেশির ভাগ শহরের বেলায় এমন উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা বাড়ছে।বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ (যার মধ্যে ১০০ কোটির বেশি শিশু রয়েছে) এখন শহরে বাস করে। বাংলাদেশে শহর এলাকায় বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রামের তুলনায় সহজে পাওয়া যায়। তবে শহরে বিত্তবৈভব ও চরম দারিদ্র্য সহাবস্থান করে। বস্তিতে বসবাসকারী বেশির ভাগ শিশুর থাকার জন্য উপযুক্ত ঘর নেই; তাদের পরিষ্কার পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব আছে। শহরের বেশির ভাগ স্কুল ও পাড়ায় শিশুদের খেলার মাঠ নেই। শহরের শিশুরা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বায়ু ও শব্দদূষণের শিকার এবং তারা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করে। ক্লিনিক-হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা শিশুবান্ধব নয়। বিভিন্ন ধরনের ভৌত অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না বললেই চলে।মেয়েশিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে কিংবা পাড়ায় যৌন হয়রানির সম্মুখীন হয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুরা সহিংসতা, শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকির মুখে থাকে। জনসমাগম হয় এমন সব স্থানে (বিমানবন্দর, বাস ও রেলস্টেশন, শপিং কমপ্লেক্স, কমিউনিটি সেন্টার ইত্যাদি) শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো কিংবা পোশাক বদলের কোনো সুযোগ থাকে না। শিশুদের পক্ষে গণপরিবহন ব্যবহার করা কঠিন। বেশির ভাগ রেস্তোরাঁয় অল্পবয়সী শিশুদের বসার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং তাদের জন্য উপযুক্ত খাবারও পাওয়া যায় না। জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারিগুলোতে সাধারণত শিশুদের চাহিদার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় না। শহরে বিনোদনমূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগও সীমিত, আর এ কারণে বিনোদন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। এর ফলে শিশুরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।শহরে শিশুরা সামগ্রিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না এবং তাদের সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরিভাবে বিকশিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা তাদের শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়। এটি শিশুদের অধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। শিশুদের জন্য মৌলিক সেবাগুলো অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। নতুন কোনো অবকাঠামো গড়ার আগে শিশুদের জন্য কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক। শিশুরা ব্যবহার করবে, এমন কোনো কিছুর নকশা তৈরির ক্ষেত্রে শিশুদের কথা শুনতে হবে, যাতে তা শিশুবান্ধব হয় এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।বিমানবন্দর, বাস ও রেলস্টেশন, শপিং কমপ্লেক্স ইত্যাদি স্থানে শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আলাদা কক্ষ থাকা দরকার। শিশুদের খেলার মাঠ দখলের সব ধরনের চেষ্টা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। পশ্চিমা দেশের উন্নত শহরে এমন খেলার মাঠ আছে, যেখানে সঙ্গে শিশু না থাকলে কোনো বয়স্ক ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারে না। নগরে সবুজ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ও জনসমাগমের স্থানগুলোতে শিশুদের বিনোদন ও খেলার জন্য ব্যবস্থা রাখতে নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। শিশু সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হয়ে শিশুদের খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা ও বিনোদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারিগুলো শিশুদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন কিছু নয় এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কাজে শিশুদের সহজেই যুক্ত করা যায়। পশ্চিমা দেশগুলোর বেশ কিছু জাদুঘরে দেখেছি, প্রদর্শিত শিল্পদ্রব্যের বর্ণনা শিশুরা সহজেই পড়তে পারে; কারণ, সেগুলো টাঙানোর স্থান ঠিক করার সময় তাদের উচ্চতার কথা ভাবা হয়েছে। তা ছাড়া বর্ণনার ভাষাও শিশুদের উপযোগী।কেউ কেউ মনে করেন, শিশুবান্ধব শহর গড়ে তোলার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ আমাদের নেই। কিন্তু সব ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি কানাডা ভ্রমণের সময় যে কয়েকটি বিষয় ভালো লাগল, তার মধ্যে আছে সেখানকার রেস্তোরাঁগুলোর সেবা। সঙ্গে শিশু থাকলেই ছবিযুক্ত কাগজ ও রংপেনসিল দেওয়া হয় বেশির ভাগ স্থানেই; এতে শিশুরা খাবার আসার আগের অপেক্ষার সময়টা আনন্দের সঙ্গে কাটাতে পারে। এই যে কাগজ আর রংপেনসিল দেওয়া হলো, এতে কি অনেক খরচ হয়েছে? মোটেই না। কিন্তু শিশুমনে যে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা হলো, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জনসমাগমের স্থান ও রেস্তোরাঁগুলোতে শিশুদের জন্য বসার ও খেলার ব্যবস্থা এবং তাদের উপযোগী খাবার পরিবেশনে কি খুব বেশি খরচ হবে?আসলে আমরা এখনো শিশুদের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে বা তাদের দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখতে শিখিনি। তাই আমরা কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিশুদের রোদে দাঁড় করিয়ে রাখি। এতে যে তাদের সম্মতি নেই বা কষ্ট হচ্ছে, সে বিষয়টি ভুলে যাই। অনেক পরিবারেই মা-বাবা বা বড়রা খাবার, পোশাক, বিনোদন নিয়ে নিজেদের পছন্দ শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেন। শিশুদের মতামত শোনার প্রয়োজন মনে করেন না বা শুনলেও গুরুত্ব দেন না। শিশুর সব কথাই যে শোনা সম্ভব, তা নয়; শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, এমন কিছু থেকে তাদের দূরে রাখা মা-বাবার দায়িত্ব। কিন্তু তেমন পরিস্থিতি হলে শিশুকে বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। আমরা কি সময় নিয়ে শিশুর সঙ্গে কথা বলছি? আমাদের দেশে আমরা কি শিশুদের শহরের বাসিন্দা বলে ভাবি এবং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সেবাগ্রহীতা মনে করি? আমরা যখন নগর-পরিকল্পনা করি, তখন কি ‘শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থ’ নিয়ে চিন্তা করি? আমরা কি শিশুদের অবস্থান থেকে অবকাঠামো ও সেবাগুলোকে দেখি? আমি আশা করি, সিটি করপোরেশনগুলো শহরগুলোকে শিশুবান্ধব করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন কিছু করি, যাতে শিশুদের অধিকারগুলো অর্জিত হয়।লায়লা খন্দকার: পরিচালক, চাইল্ড রাইটস গভর্ন্যান্স ও চাইল্ড প্রোটেকশন, সেভ দ্য চিলড্রেন।
First published on প্রথম আলো (Prothom Alo) | 18 অক্টোবর 2017




