শিশুরা কেন বই পড়বে? কোন ধরনের বই পড়বে?

‘আমাদের স্টলে আসার আগে সন্তানকে দামি আইসক্রিম কিনে দিচ্ছেন, কিন্তু বইয়ের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন করছেন, এমন অনেক অভিভাবক আছেন।’ বলছিলেন শিশুদের বইয়ের একজন প্রকাশক। বছর কয়েক আগে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলায় তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল।

এই প্রকাশক বলছিলেন, খাবার, পোশাক, বেড়ানো ইত্যাদিতে খরচ করার ব্যাপারে অনেক অভিভাবকের আগ্রহ ও সামর্থ্য আছে, কিন্তু বই কেনায় অনীহা কেন? অনেকেই মনে করছেন, শিশুরা ইন্টারনেটে ভিডিও দেখেই অনেক কিছু শিখছে; বই পড়ার দরকার নেই।

বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা

বই শিশুদের আনন্দ দেয়। তা ছাড়া বই শিশুদের মৌলিক ভাষাদক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং তাদের শব্দভান্ডারকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করে, যা অন্য কোনো মাধ্যমের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। এর ফলে তাদের যোগাযোগের ক্ষমতা বাড়ে; কথা বলা, লেখা, অনুভূতির প্রকাশসহ সবকিছুই সহজ হয়।

বই একমুখী নয়, বই সংলাপ তৈরি করে এবং শিশুকে ভাবায়। বই শিশুদের চিন্তা ও বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়ায়। একটি বই পড়া হয় একান্ত ব্যক্তিগতভাবে। সেখানে কোনো হাসির ট্র্যাক নেই, নেই এমন কোনো সুর যা পাঠকের আবেগকে আগে থেকেই প্রভাবিত করে।

বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পাঠক কী ভাববেন, তা পুরোপুরি তাঁর সিদ্ধান্ত। কেউ বলে দেয় না, কীভাবে ভাবতে হবে। এই স্বাধীনতাই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।

মানুষের সৃজনশীলতার মূলে আছে কল্পনাশক্তি। বই-এর মাধ্যনে শিশুরা কল্পনায় দেখতে, শুনতে, স্বাদ নিতে, অনুভব করতে ও গন্ধ নিতে শেখে। বই শিশুদের কল্পনাশক্তির বিকাশে সহায়তা করে, তাদের জগৎকে আরও বিস্তৃত করে। বই পড়লে ভাষার ওপর দখল তৈরি হয়। আর ভাষার ওপর দখল মানেই চিন্তার ওপর দখল। তাই যদি আমরা জাতি হিসেবে চিন্তার চর্চা ধরে রাখতে চাই, তাহলে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতেই হবে।

পুরোনো অনেক গল্প বর্ণবাদী মানসিকতা ও জেন্ডার স্টেরিওটাইপ তুলে ধরে (যেমন রানির ‘দুধে আলতা’ গায়ের রং, রাজকন্যাকে ‘উদ্ধার’ করবে রাজপুত্র)। এ ধরনের বই শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো তাদের পড়তে দেওয়া উচিত নয়।

বইয়ের সঙ্গে পরিচয় শুরু হোক শিশুর জন্মের পর থেকেই

অনেকে ভাবেন শিশু যখন লেখাপড়া শিখবে, তখনই সে বই পড়বে। কিন্তু তিন থেকে ছয় মাস বয়সেই শিশুদের বই দেওয়া উচিত। সেই বইগুলো এমন হতে পারে, যাতে কোনো লেখা নেই, শুধু ছবি আছে। যখন শিশু কথা বলতে ও বুঝতে শেখে, তখন থেকেই যদি মা-বাবা এবং অভিভাবকেরা বই পড়ে শোনান, তাহলে তারা বই ভালোবাসতে শিখবে। যখন শিশু পড়তে শুরু করে, তখনই তার নিজের পড়ার জন্য বই দিতে হবে।

বই কেনার জন্য পারিবারিক বাজেটে বরাদ্দ রাখা এবং সন্তানদের পছন্দমতো বই কেনার স্বাধীনতা দেওয়া প্রয়োজন। পাঠাগার, বইমেলায় এবং বইয়ের দোকানে নিয়ে যাওয়া, শিশু বই পড়ে গল্প বা প্রশ্ন করলে আগ্রহ নিয়ে শোনা এবং আলোচনা করা, বিভিন্ন উৎসব ও জন্মদিনে উপহার হিসেবে বই দেওয়া শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গঠনে ভূমিকা রাখে। মা-বাবাকে বই পড়তে দেখলে শিশুরা জানবে যে বই পড়া প্রতিদিনের জীবনের একটা অংশ।

প্রয়োজন ভালো মানের বই

সন্তানদের জন্য বই কিনতে চান, কিন্তু বাংলায় এমন বই নেই যা পড়তে তারা আগ্রহী হবে, বইয়ের প্রকাশনার মান শিশুদের আকৃষ্ট করে না, এ ধরনের অভিযোগ কোনো কোনো অভিভাবক করেন। বর্তমানে শিশুরা দৃশ্যনির্ভর জগতে বাস করে। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বইকে অত্যন্ত মানসম্মত হতে হবে। কারণ, বিভিন্ন বয়সের শিশুদের অনুভূতি, চিন্তাভাবনা ও পড়ার গতি আলাদা হয়।

পরিবার, সমাজ ও পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। এসব বিবেচনা করেই বই লিখতে হবে। এ ক্ষেত্রে লেখক, আঁকিয়ে, প্রকাশকসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

প্রকাশকদের শিশুতোষ বই প্রকাশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বইয়ের বিষয়, ভাষা, অলংকরণ, কাগজ ও ছাপার মান উন্নত করে শিশুদের উপযোগী বই প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, চিরায়ত সাহিত্য, রূপকথা, পুরাণসহ নানা বিষয়ে বই প্রকাশ করা দরকার।

শিশুদের জন্য ক্ষতিকর বই পরিহার করুন

শিশুদের বই পড়তে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের কী বই পড়তে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। শিশুদের এমন বই দিতে হবে যা তাদের আনন্দ দেয়, কল্পনাশক্তির বিকাশে সাহায্য করে, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল হতে অনুপ্রেরণা জোগায়, বাংলাদেশ ও বিশ্বের নানা দেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল করে তোলে, বয়স অনুযায়ী বিজ্ঞান, সমাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানায়, চিন্তা ও প্রশ্ন করতে উদ্দীপ্ত করে এবং আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলে।

পুরোনো অনেক গল্প বর্ণবাদী মানসিকতা ও জেন্ডার স্টেরিওটাইপ তুলে ধরে (যেমন রানির ‘দুধে আলতা’ গায়ের রং, রাজকন্যাকে ‘উদ্ধার’ করবে রাজপুত্র)। এ ধরনের বই শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো তাদের পড়তে দেওয়া উচিত নয়।

শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ায় সবার ভূমিকা আছে

‘আমার ছেলে (১৩ বছর) এবং মেয়ের (১০ বছর) জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই আমরা তাদের বই পড়ে শুনিয়েছি। এর পর থেকে তাদের নানা বিষয়ে বয়স উপযোগী বই কিনে দিই। কোনো বড় শহরে বেড়াতে গেলে অন্যান্য ঘোরাঘুরির পাশাপাশি বইয়ের দোকানে যাওয়া আমাদের পরিকল্পনার অংশ।

আমরা বই কিনি, সন্তানদের জন্যও কেনা হয়। নিজেদের সংগ্রহের বইয়ের পাশাপাশি তারা স্কুল থেকে বাসায় বই এনে পড়তে পারে। স্কুলে কখনো তাদের গল্প লিখতে দেয়, কখনো বা তারা বাড়ির কাজ হিসেবে একটা বই লেখা, তার জন্য ছবি আঁকা এবং প্রচ্ছদের নকশা করতে শেখে।

দ্বিতীয় মাসেও বই পেল না শিক্ষার্থীরা

‘এডমন্টনে আটটা পাবলিক লাইব্রেরি আছে। সেখান থেকেও বই এনে পড়া যায়। পাবলিক লাইব্রেরিতে শিশুদের জন্য গল্প পাঠের আসর বসে। লাইব্রেরির উদ্যোগে স্কুলের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বই পড়াসংক্রান্ত প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। এতে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। এখন বইয়ের দোকানে নিয়ে গেলে তারা নিজের পছন্দ অনুযায়ী বই বাছাই করে। বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ে তাদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, গড়ে উঠছে নিজস্ব পাঠরুচি।’

কথাগুলো বলছিলেন কানাডাপ্রবাসী এক বাংলাদেশি নারী। তাঁর বক্তব্য থেকে এটা বোঝা যে শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গঠনে মা-বাবার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণ পাঠাগার যাতে শিশুদের বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অনস্বীকার্য।

লায়লা খন্দকারউন্নয়নকর্মী

*মতামত লেখকের নিজস্ব


First published on প্রথম আলো (Prothom Alo) | 7 ফেব্রুয়ারি 2026

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top