হার্ভার্ডে পড়ার সময় সেমিস্টারের শেষে প্রতিটি কোর্সের মূল্যায়নে অংশ নিতে হতো। শিক্ষার্থীরা নাম প্রকাশ না করেই শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতেন। যেসব বিষয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হত তার মধ্যে ছিল শিক্ষার্থীদের নতুনভাবে ভাবতে সহায়তা করা, পাঠদানের সময় সঠিকভাবে কাজে লাগানো, শ্রেণিকক্ষের আলোচনা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা, শিক্ষার্থীদের উপকারী ফিডব্যাক দেওয়া, ভিন্নমত এবং নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, ক্লাসের বাইরেও শিক্ষার্থীদের সময় দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের সম্মান করা।
আমাদের এক শিক্ষক বলেছিলেন যে, এর আগের বছরে এক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করেননি। তারপর খুব দুঃখের সঙ্গে যোগ করলেন, ‘নিজেকে প্রশ্ন করলাম-“আমি কি ভুল করেছি যে শিক্ষার্থী শিখতে পারেনি?”
হার্ভার্ডে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরস্পরের কাছ থেকে শেখেন; রয়েছে এক পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক। এক বিষয়ে ফাইনাল পেপার জমা দেওয়ার আগে অধ্যাপক ই-মেইল করেছিলেন যে, আমাদের লেখা প্রবন্ধ পড়া এবং তা থেকে শেখার জন্য তিনি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। এই বিনয় ও শেখার মানসিকতা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
প্রতিটি কোর্সে মূল শিক্ষকের পাশাপাশি একাধিক টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকতেন। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে তাঁদের কাছে যাওয়া যেত, চাইলে শিক্ষকের কাছেও। আমার কোর্সটা ছিল অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের জন্য; অনেকেই দীর্ঘদিন পর আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছিলেন। তাই মূল কোর্স শুরুর আগে প্রায় পাঁচ সপ্তাহের প্রস্তুতিমূলক সময় ছিল। গণিত, পরিসংখ্যান ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত “স্টুডিও ল্যাব” হতো, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাজ করতে পারতেন এবং শিক্ষকরা পাশে থাকতেন সহায়তার জন্য। এই শিক্ষার্থী-সংবেদনশীল আয়োজনটি আমার খুব ভালো লেগেছিল।
শিক্ষার্থীরা যাতে লেখাপড়ায় সফল হতে পারেন, তা নিশ্চিত করা শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব-এই বোধ হার্ভার্ডে পড়ার সময় তীব্র ভাবেই হয়েছে।
হার্ভার্ডসহ নামকরা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ও অনেক দায়িত্ব আছে। প্রতি ক্লাসে পড়াশোনা করে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া, শ্রেণিকক্ষে আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা, সব অ্যাসাইনমেন্ট এবং পরীক্ষা সময়মতো এবং সততার সঙ্গে শেষ করা, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের সম্মান করা ইত্যাদি।
কোর্স শুরুর আগেই আমদের বেশ কিছু ভিডিও পাঠানো হয়েছিল। তার একটিতে খুব স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে পড়াশুনা করে ক্লাসে গেলেই শ্রেনীকক্ষের শেখা অর্থপূর্ণ হবে।পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছিল যে, শিক্ষকরা সর্বোচ্চমানের শিক্ষা প্রদান করবেন।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন হার্ভার্ডের বাজেট অনেক বেশি। সেটা ঠিক। তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং শেখার সংস্কৃতির সঙ্গে সবসময় আর্থিক সক্ষমতার সম্পর্ক নেই। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতা।







