হাইপেশিয়াঃ পঞ্চম শতাব্দীর আলেকজান্দ্রিয়ায় একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক

হাইপেশিয়ার সাথে পরিচয় হঠাৎ করেই! বছর দশেক আগে ব্রিসবেনের নদীর পাড়ে এক বিকেলে হাঁটছিলাম। সেখানে একটা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আছে। নাটক হচ্ছিল। “ফ্র্যাকশন্স”-এর কাহিনী হাইপেশিয়াকে নিয়ে- তা জেনে দেখার আগ্রহ হোল।

কে এই হাইপেশিয়া? তাঁর জীবন নিয়ে খুব বেশী কিছু জানা যায় না, কারণ দীর্ঘদিন তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। শুধুমাত্র গত দুই শতকে হাইপেশিয়াকে বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষত জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে সম্মান জানানো শুরু হয়েছে। তাঁর জীবন নিয়ে নানা ভাষায় সাহিত্য রচিত হচ্ছে। 

এটুকু জানা গেছে যে, হাইপেশিয়া ছিলেন এক গণিতবিদ ও দার্শনিক। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় (বর্তমানে যা মিশরের অন্তর্ভুক্ত) বসবাস করতেন। তাঁর বাবার নাম থিওন আলেকজান্দ্রিকাস (৩৩৫-৪০৫); যিনি ছিলেন গণিতবিদ এবং আলেকজান্দ্রিয়া জাদুঘরের সাথে যুক্ত গণিতের শিক্ষক। গ্রীক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এই জাদুঘরে অনেকগুলি বিষয়ের স্বতন্ত্র বিদ্যালয় এবং বিখ্যাত আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার ছিল।

হাইপেশিয়া পড়াশুনা করেছেন এথেন্স ও ইতালীতে। ৪০০ খ্রীস্টাব্দে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার প্লেটোনিস্ট স্কুলের প্রধান হন। সেখানে তিনি খ্রীস্টান, খ্রীস্ট ধর্মের অনুসারী নয়, বিদেশী-সব ধরণের শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তিনি শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা তাঁর কাছে পড়তে আসত। তিনি খুব সম্ভবত গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শন নিয়ে লিখেছেন; যার মাঝে গ্রহের গতিশীলতা এবং সংখ্যা বিষয়ক তত্ত্ব আছে। 

তিনি বিদ্বান পুরুষদের মত পোশাক পরতেন, সাধারণ নারীদের মত নয়। অন্য শহরে বসবাসকারী জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কেউ কেউ তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন। এছাড়া স্বাধীনভাবে নিজের বাহনে করে শহরে চলাফেরা করতেন, যা তখনকার নারীরা সচরাচর করতেন না। বিভিন্ন বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশেও তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন। তাঁর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজনৈতিক প্রভাব ছিল।

তখন আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্ণর ছিলেন অরেস্টেস। তিনি ও হাইপেশিয়া খ্রীস্ট ধর্ম অনুসরণ করতেন না। ফলে অরেস্টেসের সাথে খ্রীস্টান বিশপ সিরিলের দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথাকথিত পৌত্তলিকতার জন্য এই বিশপের অবস্থান ছিল হাইপেশিয়ার বিরুদ্ধে। বলা হয়ে থাকে যে, ৪১৫ খ্রীস্টাব্দে সিরিলের এক বক্তৃতার পরপরই জনতা ক্ষিপ্ত জনতা হাইপেশিয়াকে বীভৎসভাবে আক্রমণ করে; যার পরিণতি তাঁর মৃত্যু। মনে করা হয় তাঁর শরীরকে খন্ড-বিখন্ড করে রাস্তায় ছড়িয়ে দিয়েছিল আক্রমণকারীরা। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেয়া হলে হাইপেশিয়ার সব লেখা চিরতরে হারিয়ে যায়। এ সম্পর্কে যৎসামান্য জানা গেছে অন্যদের লেখা থেকে এবং কিছু চিঠিপত্রের মাধ্যমে।

“ফ্র্যাকশন্স” ১৬০০ বছর আগের কাহিনী, তবে বর্তমান সময়েও তা কি খুব প্রাসঙ্গিক নয়? নাটকটি দেখতে দেখতে অনেক ভাবনা আসছিল। প্রথমত মনে হল, হাইপেশিয়া মূলত একজন স্বাধীনচেতা শিক্ষক ও গবেষক। যিনি নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে নিজের কাজ করতে চেয়েছেন। সেই “অপরাধেই” কি এমন নির্মমভাবে প্রাণটা দিতে হোল? পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে একাকী সে সংগ্রাম। এখন সময় পাল্টেছে; নারীরা নানা পেশায় নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছে। কিন্তু বিভিন্ন ভাবে লড়াইটা কি চলছে না? নিজের এবং অন্য অনেক নারীর অভিজ্ঞতায় জানি, সে যুদ্ধে জয় আসতে আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। 

হাইপেশিয়ার মত স্বাধীন মতামতের অধিকারী ও তা প্রকাশে দ্বিধাহীন নারীদের কি এখনো ভাল চোখে দেখা হয়? যে আচরণের জন্য পুরুষদের নেতৃত্বের গুণ আছে বলে কোন সংস্থা মনে করে সেই ধরণের ব্যবহার কোন নারী কর্মী করলে কি অনেক ক্ষেত্রেই তাকে “আগ্রেসিভ” বলা হয় না? হাইপেশিয়াসহ এই ধরণের নারীরা সমাজকে আলোড়িত করেন তাঁদের কাজ আর সবকিছু বিনা প্রশ্নে মেনে না নেয়ার মাধ্যমে। প্রত্যেক যুগেই কিছু নারী থাকেন-যাঁরা সমাজের বেধে দেয়া ছকে জীবন যাপন না করে নিজের শর্তে বাঁচার সাহস রাখেন, আর তাঁরাই পালন করেন নানা ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা।

হাইপেশিয়া যে পুরুষদের মত পোশাক পরতেন, কখনো বিয়ে করেননি এবং মা হননি-এই বিষয়গুলি ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই সিদ্ধান্ত তাঁর নিজস্ব। হাইপেশিয়া কি ভেবেছিলেন যে নারীর পোশাকে তাঁকে অনেকে গুরুত্বের সাথে নেবে না? এখনো অনেক স্থানে নারীর কাজকে গুরুত্ব না দিয়ে তাঁর পোশাক, চেহারা নিয়ে আলাপ করা হয়। মা হিসেবে বা পরিবারের অন্য সদস্যের পরিচর্যায় দায়িত্ব পালন আর পেশাগত জীবনে সাফল্য বজায় রাখতে হিমশিম খায় পৃথিবীর বেশীর ভাগ কর্মজীবী নারী। পঞ্চম শতাব্দীর আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থাটা কেমন ছিল তা বোঝা কষ্টকর নয়। 

হাইপেশিয়ার চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন জোলেন অ্যান্ডারসন। তাঁর একা লড়াই-এর সাহস, দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব, বিশুদ্ধ জ্ঞানতৃষ্ণা, হার মেনে না নেয়া ইত্যাদি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। 

হাইপেশিয়ার জীবন ও সময় থেকে তথ্য নিয়ে কাল্পনিক নাটকটি লিখেছেন মার্সেল ডরনি। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, “কেউ কেউ হাইপেশিয়াকে প্রথম দিকের নারীবাদী হিসেবে মনে করেন, কারণ তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী পদ অধিকারী নারীদের একজন। আপনি কি এর সাথে একমত?” তাঁর উত্তর, “আমি যে হাইপেশিয়া সৃষ্টি করেছি তা নারী-পুরুষ সবার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। খেয়াল করবেন, নাটকের সব চরিত্র পুরুষ; সেটা ইচ্ছাকৃত। পুরুষের বিশ্বে এক নারীর চিত্র আঁকার জন্যই তা করেছি।” 

আমার কাছেও মনে হয়েছে, যে কোন মানুষ হাইপেশিয়ার জীবন থেকে প্রেরণা পেতে পারেন। ধর্মান্ধতার কারণে লেখক আর গবেষকের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার ঘটনা কি পৃথিবীর নানা দেশেই ঘটছে না? আর তাই কার্ল সাগানের মত লেখকদের কাছে হাইপেশিয়া বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তক জিজ্ঞাসার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তিনি “কসমস” গ্রন্থে তাঁর অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top